আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষে চীন ছাড়লেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। আজ শুক্রবার (১৫ মে) এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্টকে এক জমকালো বিদায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়। বিদায়ী অনুষ্ঠানে লাল গালিচার দুপাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে মার্কিন ও চীনা পতাকা নাড়িয়ে শুভেচ্ছা জানান কর্মকর্তারা।

আজ শুক্রবার ছিল ট্রাম্পের চীন সফরের তৃতীয় ও শেষদিন। সফরের শেষ করার অংশ হিসেবে আজ সকালে এক সময়ের রাজকীয় উদ্যান বেইজিংয়ের ঝোংনানহাই কমপ্লেক্সে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে চূড়ান্ত আলোচনায় বসেন ট্রাম্প।
 
এই ঝোংনানাহাই কমপ্লেক্স-এ ক্ষমতাসীন চীনা কম্যুনিস্ট পার্টি এবং স্টেট কাউন্সিল বা চীনের মন্ত্রসভার কার্যালয় অবস্থিত। জায়গাটি রাজধানীর বিখ্যাত প্রত্নস্থল ফরবিডেন সিটির সংলগ্ন এবং তিয়ানানমেন স্কোয়ারের কাছেই।
 
ট্রাম্পকে প্রাচীরঘেরা ঝোংনানহাই চত্বরে অবস্থিত শতবর্ষী বৃক্ষরাজি পরিদর্শনের এক বিরল সুযোগ দেয়া হয়। বাগানের কিছু গাছের বয়স এক হাজার বছরেরও বেশি যা দেখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রীতিমতো বিস্ময় প্রকাশ করেন।
 
ভিডিওতে দেখা যায়, শি জিনপিং নিজেই ট্রাম্পকে কড়া নিরাপত্তাবেষ্টিত এই কমপ্লেক্সের নান্দনিক বাগানপথ, লেকপাড়ের করিডর এবং ফুলে সাজানো বিভিন্ন অংশ ঘুরিয়ে দেখাচ্ছেন। এ সময় ট্রাম্প চীনা প্রেসিডেন্টকে প্রশ্ন করেন, অন্য বিদেশি নেতাদেরও কি এই কমপ্লেক্সে স্বাগত জানানো হয়?
 
 
জবাবে শি বলেন, ‘খুবই কম। শুরুতে আমরা এখানে সাধারণত কোনো কূটনৈতিক অনুষ্ঠান করতাম না। পরে কিছু আয়োজন শুরু হলেও সেটি এখনো অত্যন্ত বিরল। যেমন (রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট) ভ্লাদিমির পুতিন এখানে এসেছেন।’
 
এরপর জিনপিং ট্রাম্পকে ২৮০ বছর পুরনো একটি গাছ স্পর্শ করার আমন্ত্রণ জানান। ট্রাম্প তখন জবাব দেন, ‘ভালো। আমার পছন্দ হয়েছে।’ এরপর ট্রাম্প ও জিনপিং শীর্ষ বৈঠকে অংশ নেন। পরে দুই দেশের প্রতিনিধিদল ব্যক্তিগত বৈঠকে অংশ নেয়।
 
গত বুধবার (১৩ মে) ট্রাম্পের চীন সফর শুরু হয়। তার এই সফরে রাজকীয় অভ্যর্থনা, কুচকাওয়াজরত সেনাদের উপস্থিতি, বিলাসবহুল নৈশভোজ এবং গোপন বাগানে ব্যক্তিগত ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। সফরকালে ট্রাম্প বারবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর প্রশংসা করেন এবং তার আন্তরিকতা ও ব্যক্তিত্বের কথা উল্লেখ করেন।
 
ট্রাম্প ও জিনপিংয়ের সবশেষ বৈঠক নিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুক্রবার স্থানীয় সময় দুপুরে বেইজিং ত্যাগ করেছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্কের জটিল সমস্যাগুলোর সমাধান হয়েছে, এমন কোনো তাৎক্ষণিক ইঙ্গিত মেলেনি। যদিও চীনা নেতা শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক আপাতত নতুন করে স্থিতিশীল হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
 
 
দুই দিনের বৈঠকে ইরান, তাইওয়ান ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন দুই নেতা। এ সময় নিবিড় দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পাশাপাশি ছিল জাঁকজমকপূর্ণ ‘সফট ডিপ্লোম্যাসি’র প্রদর্শনও। প্রায় এক দশক পর বেইজিংয়ে দীর্ঘদিনের এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী নেতার মুখোমুখি বৈঠককে ঘিরে কূটনৈতিক উষ্ণতার বিশেষ আয়োজন দেখা যায়।
 

ট্রাম্প-শি বৈঠকে ইরান যুদ্ধের ছায়াবেইজিং সফরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট জিনপিংয়ের বৈঠকের ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে ইরান যুদ্ধ ইস্যু। আলোচনার আগে ধারণা করা হচ্ছিল, ট্রাম্প তার চীনা সমকক্ষকে ইরান সংকট সমাধানে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে রাজি করাতে পারেন।

 
ইরানের ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক অংশীদার এবং দেশটির তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন বরাবরই যুদ্ধ চলাকালে নিজেকে শান্তির পক্ষের শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে।
 
বৃহস্পতিবার দুই নেতার মধ্যে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ইরান প্রসঙ্গ আলোচনায় আসে। তবে সফর শেষে বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে এমন কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি যে, তারা তেহরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দাবির পক্ষে চাপ প্রয়োগ করবে। বরং দুই পক্ষের বক্তব্যে এখন পর্যন্ত ইঙ্গিত মিলেছে, শীর্ষ বৈঠকটি এ ইস্যুতে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি আনতে পারেনি।
 
ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, শি জিনপিং ইরান সংকট সমাধানে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন এবং ইরানকে সামরিক সরঞ্জাম না দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বৃহস্পতিবার (১৪ মে) এনবিসি নিউজকে দেওয়া পৃথক সাক্ষাৎকারে জানান, ইরান সংকট সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র চীনের সহায়তা চায়নি।
 
হোয়াইট হাউসের প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, দুই দেশ একমত হয়েছে যে স্ট্রেইট অব হরমুজ অবশ্যই উন্মুক্ত রাখতে হবে এবং ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে পারবে না।
 
 
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, শি জিনপিং ‘জলপথটিকে সামরিকীকরণের বিরোধিতা এবং এর ব্যবহারে টোল আরোপের যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে চীনের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।’ পাশাপাশি চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বেশি তেল আমদানির আগ্রহ দেখিয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
 
বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে নতুন জ্বালানি চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, যেখানে ইরানি তেলের বড় ক্রেতা চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকেও তেল আমদানি বাড়াতে পারে। তবে ট্রাম্প-শি বৈঠক ইরান সংকটে বাস্তব কোনো প্রভাব ফেলবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। কারণ বেইজিং মূলত তাদের আগের অবস্থানই পুনর্ব্যক্ত করেছে।
 
চীন ইতোমধ্যে একাধিকবার বলেছে, তারা শান্তি আলোচনায় সহায়তার জন্য যা সম্ভব করবে। গত মাসে শি জিনপিং স্ট্রেইট অব হরমুজে ‘স্বাভাবিক নৌ চলাচল বজায় রাখার’ আহ্বান জানিয়েছিলেন। একই সঙ্গে চীনের নীতিগত অবস্থান হলো, তারা সংঘাতে জড়িত কোনো দেশকে অস্ত্র সরবরাহ করে না।
 
বেইজিং ইরানের এই ঘোষণাকে সমর্থন করে যে তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না, যদিও শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি পরিচালনার অধিকার ইরানের রয়েছে বলেও তারা মনে করে।
 
শুক্রবার সকালে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এই যুদ্ধ কখনোই হওয়া উচিত ছিল না।’ একই সঙ্গে তারা দাবি করে, এ বিষয়ে চীনের অবস্থান ‘একেবারেই পরিষ্কার।’
 

অন্যদিকে ট্রাম্পও মনে হয় বুঝতে পেরেছেন, ইরানের ওপর বেইজিং কতটা চাপ প্রয়োগ করবে তার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফক্স নিউজে তিনি বলেন, ‘দেখুন, তিনি বন্দুক নিয়ে আসছেন না… গুলি ছুড়তেও আসছেন না।’ ইরানের ওপর শি জিনপিং প্রভাব খাটাবেন কি না জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, ‘তিনি খুবই ভালো আচরণ করেছেন।’